আজ ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের বিছানা থেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গে

জনতার ডেক্স : শেষ হয়ে গেল বাঙালির গৌরবের, বাঙালির সংগ্রামের মাস। আবার এ মাস পাব কি না জানি না। এর মধ্যে হয়ে গেল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। স্বাধীন দেশে ৫০ বছর বেঁচে থাকব, ভালোমন্দ দেখতে পাব এটা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভাবিনি। আর এও ভাবিনি ৩০ লাখ মানুষের রক্তস্নাত বাংলাদেশ কখনো এমন হবে। ২০২১-এর সেপ্টেম্বরের ১১-১২ তারিখ হঠাৎই মধ্যরাতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। পেটে প্রচন্ড যন্ত্রণা। অপ্রস্তুত থাকার কারণে কোনো পাত্র না থাকায় বিছানার পাশে ফ্লোরে বমি করেছিলাম তিন-চার বার। পায়খানা বেশ পাতলা হয়েছিল। রাত দেড়টা থেকে প্রায় ৬টা- অসম্ভব যন্ত্রণায় একাই কাটিয়েছিলাম। আমার স্ত্রী কুশিমণিকে নিয়ে পাশের ঘরে থাকেন। দরজা খুলে এক ডাকেই সবাইকে পেয়েছিলাম। খুব হুলুস্থূল করে ছেলেমেয়ে, স্ত্রী, সহকর্মী সবাই হাজির। ৪০ বছর ধরে ফরিদ আছে। আমার সব অসুস্থতায় সে সঙ্গী হয়। এক যুগের মতো আলমগীর আছে। সেও একই রকম। যে কোনো কষ্ট হাসিমুখে মেনে নেয় সব সময়। মনে হয় দিনটা ছিল ১৩ সেপ্টেম্বর। আমাদের শরীর-স্বাস্থ্যের সব সময় খোঁজখবর রাখেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ। দারুণ ভালো মানুষ। আরেক প্রিয় ডাক্তার নাজির আহমেদ রঞ্জু। রঞ্জু আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে ছিল। সে ডাক্তার হয়েছে প্রফেসর হয়েছে। রঞ্জু এবং আবদুল্লাহ ভাইকে জিজ্ঞেস না করে আমার স্ত্রী এক পা-ও ফেলেন না। তাই আবদুল্লাহ ভাইকে ফোন করেছিলাম। তিনি সঙ্গে সঙ্গে কী একটা ওষুধের নাম বলেছিলেন। সারা দিনে মনে হয় তিনবার খেয়েছিলাম। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। আবদুল্লাহ ভাইয়ের ওষুধে কখনো এমন হয় না। তখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক মো. শারফুদ্দিন আহমেদকে জানিয়েছিলাম। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার ডা. শরিফুল ইসলামকেও বলেছিলাম। ডা. শরিফ মুক্তিযুদ্ধে যেমন অংশগ্রহণ করেছিল, তেমনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিরোধযুদ্ধেও শামিল হয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নিয়েছিল এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে এক সফলতার চূড়ায় নিয়ে গিয়েছিল। না হলে গারো পাহাড়ের পাদদেশে কালাজ্বর আর ম্যালেরিয়াতেই আমাদের অর্ধেক মানুষ মারা যেত। মনে হয় ১৫ তারিখ প্রথমে কেবিন ব্লকের ভিভিআইপি ২১২ নম্বর কেবিনে ভর্তি হয়েছিলাম। আমাদের ভরসাস্থল অধ্যাপক এ বি এম আবদুল্লাহ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন প্রায় ১০-১২ দিনের জন্য। সেখান থেকে ফিরেই আমাকে দেখতে এসেছিলেন। হাসপাতালে এসেও চার দিন যন্ত্রণায় কোনো হুঁশজ্ঞান ছিল না। জ্বর, পেটে ব্যথা ছিল। এরপর নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ে গলব্লাডারের একেবারে মুখে এক পাথর চাপা পড়ে আছে। ভর্তি হয়েছিলাম মেডিসিনে, বদলি করা হয় সার্জারিতে। তারা ১০-১৫ জন বোর্ড বসিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা করে অপারেশনের দিন-তারিখ ঠিক করেছিলেন। মনে হয় ১৮ তারিখের করোনা টেস্টে ফল ছিল নেগেটিভ, রক্ত পরীক্ষায় বিলোরবিন একটু বেশি। পরদিনই বিলোরবিনের মাত্রা নেমে যায়। কিন্তু পরদিন করোনা টেস্টে ফল আসে পজিটিভ। সবকিছু উলটপালট হয়ে যায়। যারা সঙ্গে ছিল একদিন আগে নেগেটিভ, পরদিন পজিটিভ। বাড়িতে বেগম সাহেবার পজিিটভ। তাঁকে আমার কেবিনে নিয়ে আসা হয়। দুই দিন পর খবর এলো ছোট মামণি কুশির পজিটিভ। এক বিশ্রী ব্যাপার। ২২-২৩ দিন পর নেগেটিভ হওয়ার তিন-চার দিন পর বাড়ি ফিরেছিলাম। তখনো মামণির পজিটিভ। আরও পাঁচ-ছয় দিন পর তার নেগেটিভ হলো। করোনা ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হলো বাবর রোডের বাড়ি থেকে। ভালোই চলছিল দিনরাত। হঠাৎ ১৯ মার্চ রাতের খাবার খেয়ে ড্রয়িং রুমে বসতেই অস্বস্তি, বুকে প্রচন্ড চাপ। গরম পানি খেয়ে চেষ্টা করে বমি করলাম। কিন্তু কোনো ভালোমন্দ নেই, যা ছিল তা-ই। কেউ বুক, কেউ পিঠ দোয়াচ্ছে, কেউ হাত-পা টিপছে এই করে অর্ধেক রাত কেটে গেল। সহকর্মী আলমগীর আমার ঘরে এসে নিচে বিছানা করল। কিন্তু কষ্ট কমল না। এভাবেই রাত কাটল, সকাল হলো। ফরিদ ছেলেমেয়ে নিয়ে তার বাড়িতেই থাকে। খবর দিয়ে তাকে আনা হলো। আসার সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘দাদা, এখনই চলুন ঢাকা চলে যাই।’ গাড়িতে বসে থাকতে পারব কি না সন্দেহ। তাই বলেছিলাম এখন নয়, আরেকটু দেখে নিই। সাড়ে ১০টা-১১টা থেকে ব্যথা কমে এলো। যখন লিখছি তখনো যেমন ব্যথা ছিল না, আগামীকাল যখন অপারেশনে যাব তখনোও হয়তো কোনো ব্যথা-বেদনা থাকবে না। তাই দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। দয়াময় আল্লাহর পর দেশবাসীই আমার একমাত্র আশ্রয়।

গতবার যখন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবিন ব্লকে ভর্তি ছিলাম তখন ব্যাপারটা প্রথম চোখে পড়ে। বাংলাদেশের দুটি বড় হাসপাতালের মধ্যে কয়েক বছর ধরে মেট্রোরেলের কাজ হচ্ছে। রোগীদের দুর্ভোগের শেষ নেই। রাতদিন কাজ চলে। কর্মতৎপরতা দেখে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না। রোগীরা ঘুমাতে পারে না। দিনরাত ঠকঠক ঢকঢক লেগেই আছে। তা-ও ভবিষ্যতের স্বস্তির কথা চিন্তা করে আনন্দিতই হয়েছি। কোনো ক্ষোভ জাগেনি মনে। দোতলা থেকে মেট্রোরেলের সবকিছু ভালোভাবে দেখা যায় না। কিন্তু পাঁচ তলার বারান্দা থেকে সবকিছু হাতের কাছে মনে হয়। এবার চোখে পড়ল এবং বিরক্তও লাগল, গত পাঁচ-ছয় দিন সারা রাত ঢকঢক ঠকঠক ঝকঝক কত বিচিত্র আওয়াজ। নানা রকমের মেশিন চলছে, লোহালক্কড় খুলছে, লাগাচ্ছে। এক মহাযজ্ঞ। কেন যেন ঠিক তখনই মনে হলো- আচ্ছা আমরা না হয় নির্মাণের সময় কষ্ট করলাম। কিন্তু বারডেম আর বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঝখানে এই যে শাহবাগের মেট্রো স্টেশন ওটার কোলাহল তো সারা জীবন, কিয়ামত পর্যন্ত সবাই ভোগ করবে। জানি না, কিয়ামত পর্যন্ত আমার দেশ থাকবে কি না, পৃথিবীর চেহারা কেমন হবে। কিন্তু যেমনই হোক এ দেশের এই ভূখন্ড যদি সচল থাকে তাহলে বারডেম আর বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের মাঝখানে মেট্রো স্টেশনের যন্ত্রণা লাখ লাখ কোটি কোটি অসুস্থ মানুষকে ভোগ করতে হবে অনন্তকাল। কয়েক বছর আগে ঢাকা-টাঙ্গাইল-বগুড়া-রংপুরের রাস্তা উন্নত হয়েছে। আগে ছিল দুই লেন এখন চার লেন। বিএনপির যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদাকে সংসদে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘মাননীয় মন্ত্রী! কারা ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কের নকশা করেছে জানি না। কিন্তু পথে পথে এলোমেলো ডিভাইডার দেওয়ার কারণে নিত্যদিন ৪-৫ এমনকি ১০টা পর্যন্ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই বেশ কয়টা ডিভাইডার ভেঙে দিতে অনুরোধ করছি।’ মাননীয় মন্ত্রী আমার অনুরোধ রেখেছিলেন। আমার একজন প্রিয় মানুষ রেজাউল হায়াত তখন ছিলেন যোগাযোগ সচিব। চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে ডিভাইডার দেখতে গিয়েছিলেন ঢাকা থেকে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা পর্যন্ত। ফেরার পথে রাবনা-তারুটিয়া-করাতিপাড়া-দেওহাটা-ধেরুয়ার ডিভাইডার ভেঙে ফেলার আদেশ দিয়েছিলেন। তাতে হাতে হাতে ফল পাওয়া যায়। যেখানে প্রতিদিন দু-তিনটি দুর্ঘটনা ঘটত সেখানে ডিভাইডার ভেঙে দেওয়ার পর মাসেও একটি দুর্ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে দিনে যেখানে ২০-২৫ জন মারা যেত সেখানে মাসেও তেমন দুর্ঘটনা হতো না এবং মারা যেত না। ভুল পরিকল্পনা মানুষের কত ক্ষতি করে তার উজ্জ্বল প্রমাণ ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়ক। সেসব এলোমেলো রোড ডিভাইডার ভেঙে দেওয়ায় কত মানুষের প্রাণ বেঁচেছে। যারা ডিভাইডার ভেঙে দিয়েছিল তারা সবাই হজের সওয়াব অর্জন করেছেন, মন্ত্রীর নজরে আনায় আমারও হয়তো অল্প বিস্তর সওয়াব হয়েছে। তেমনি ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং বারডেমের মাঝামাঝি রেলস্টেশন সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এবং আমার বক্তব্য- যারা এ রাস্তার অ্যালাইনমেন্ট করেছেন, নকশা করেছেন, স্টেশন বসিয়েছেন তারা কি একটু ভেবে দেখতে পারতেন না, দেশের দুটি শ্রেষ্ঠ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের ২০০ গজ উত্তরে অথবা ২০০ গজ দক্ষিণে স্টেশন স্থাপন করলে কী এমন ক্ষতি হতো? কত মুমূর্ষু রোগী যন্ত্রণার হাত থেকে বেঁচে যেত। যারা মেট্রোরেলের নকশা করেছেন, যারা নির্মাণ করছেন তারা অনেক সওয়াবের কাজ করতেন। স্টেশনটি আগে পিছে করলে কতটা সুবিধা হতো ভাবীকাল বিচার করবে। যারা করেছেন তারা হয়তো বলবেন, রোগীদের সুবিধার জন্য করেছেন। বলতে পারেন। কারণ কথা বলতে ট্যাক্স লাগে না। তবে কথাটা যৌক্তিক হবে না। কারণ দেশের এ সর্বোচ্চ দুটি চিকিৎসা কেন্দ্রে যারা আসবেন তারা বেশিসংখ্যক মেট্রোয় আসবেন না। আসবেন কেউ গাড়িতে, কেউ অ্যাম্বুলেন্সে।

জানি না এ প্রসঙ্গের অবতারণা করে আমি টিকে থাকতে পারব কি না, নাকি তুফানে ভেসে যাব। তবু অন্তরের নির্দেশে মনের কথা না বলে থাকতে পারলাম না, তাই বললাম। আমেরিকার প্রতি আমাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু রাশিয়ার প্রতি আছে। সেনাবাহিনী থেকে বহিষ্কৃত কিছু বিপথগামীর হাতে বঙ্গবন্ধু নিহত হলে বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ইউজিন বুস্টার পিতার মৃত্যু নিশ্চিত করে আমেরিকায় খবর পাঠিয়েছিলেন। যিনি চিলির আলেন্দেকে হত্যা করে বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করার দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন। রাশিয়া-ইউক্রেন রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ অবশ্যই বেদনাদায়ক। প্রায় অর্ধকোটি মানুষ দেশত্যাগী সর্বহারা- এটাও খুব কষ্টের এবং নিন্দনীয়। যারা ক্ষমতাবান তাদের দয়া করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে একটু চিন্তা করতে অনুরোধ করব, রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করেছে, না তাকে আক্রমণে বাধ্য করা হয়েছে? একটা কথা খোলাখুলি বলাই ভালো, দেশ আর নৌটাংকি এক না। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি একসময় একজন কৌতুক অভিনেতা ছিলেন। জগৎটাকে কৌতুক অভিনয়ের মঞ্চ ভাবলে হবে না। দেশ নিয়ে কৌতুক চলে না। ইউক্রেনের নেতা তাঁর দেশ নিয়ে তেমনটাই কি করেননি? তাঁকে সব সময় উসকানো হয়েছে, সারা বিশ্ব তাঁর পেছনে। আমেরিকা তো আছেই। তাঁকে কিছু করতে হবে না। শুধু শুরুটা করলেই হলো। চারদিক থেকে সব পশ্চিমা শক্তি রাশিয়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। জেলেনস্কি শুধু উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া যখন ইউক্রেন আক্রমণ করে তখন সবার আগে আমেরিকা পিছুটান দেয়। পৃথিবীর মোড়ল আমেরিকার কত বড় বড় ব্যর্থতা। তা-ও যদি তারা লজ্জিত না হয় কে তাদের লজ্জা পাওয়াবে? বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভিয়েতনাম থেকে তাদের কাপড়-চোপড় ফেলে লেজ গোটাতে হয়েছিল। আবার ২০ বছর আফগানিস্তানকে কবজায় রেখে ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট শান্তিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ত্যাগের চুক্তি হলে ১৪-১৫ আগস্টের মধ্যেই বিনা রক্তপাতে তালেবান আফগানিস্তান দখল করে নেয়। কাবুল সরকার পরাজিত হয়। প্রায় ৩ লাখ আমেরিকার তৈরি আফগান সেনা, হাজার হাজার সাঁজোয়া যানবাহন, হেলিকপ্টার, বিমান, লক্ষ কোটি টাকার অস্ত্র কোনো কিছুই কাজে আসেনি। ঠিক আছে পৃথিবীর পরাশক্তি আমেরিকা, মোড়লপানা করার একটা খায়েশ তো তাদের সব সময়ই থাকবে। কিন্তু এখন দুনিয়ায় কেউ কাউকে মোড়ল মানে না। আমাদের দেশ বাংলাদেশ প্রথম অবস্থায় জাতিসংঘের প্রস্তাবে কোনো সাড়া দেয়নি, ভোটদানে বিরত ছিল। কিন্তু কেন যে সেদিন বাংলাদেশ ইউক্রেনের পক্ষ নিয়েছে, এই পক্ষ নেওয়ায় ইউক্রেনের কী সুবিধা হবে, আমাদেরই-বা কী লাভ হবে বুঝতে পারলাম না। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায় ছিলেন জানি না। আর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাঁর অনুমতি নিয়ে অমনটা করেছেন বলে তো মনে হয় না। তিনি তো এর আগে অনেক আন্তর্জাতিক বিষয় বাংলাদেশের পক্ষে চোখ ধাঁধানো পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাহলে ইউক্রেন-রাশিয়ার ক্ষেত্রে এমনটা হবে কেন? এটা তো কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। ইউক্রেনের পক্ষ নেওয়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মত আছে? আমার তো একেবারেই বিশ্বাস হয় না। মুক্তিযুদ্ধে মহান ভারত ছাড়া একমাত্র বৃহৎ শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সমর্থন করেছিল। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আমেরিকা যখন বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠাচ্ছিল, সোভিয়েত ইউনিয়ন তার নৌবহর নিয়ে এগিয়ে না এলে, বাধা না দিলে আমরা হয়তো আজও পরাধীন থাকতাম। বঙ্গবন্ধুর ফাঁসি হতো, আমার ফাঁসি হতো, আমাদের অনেক নেতার ফাঁসি হতো, জিয়াউর রহমানও বাদ যেতেন না, অনেক জেনারেল ফাঁসিতে ঝুলতেন। সেখান থেকে আমরা রক্ষা পেয়েছিলাম সোভিয়েত বা রাশিয়ার কারণে। আমরা যখন দুর্বার গতিতে ঢাকার দিকে এগোচ্ছিলাম তখন জাতিসংঘের যুদ্ধ বিরতির প্রস্তাবে একমাত্র রাশিয়া আমাদের পক্ষে ভেটো দিয়েছিল। যে কারণে সিসফায়ারের আগেই আমরা ঢাকা দখল নিতে পেরেছিলাম। যার ফলে আজকের বাংলাদেশ। শুধু তাই নয়, যুদ্ধ শেষে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর শত্রুর পেতে রাখা মাইন মুক্ত করেছিলেন। যুদ্ধের কারণে জাহাজ ডুবে চ্যানেল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডুবন্ত জাহাজ সরিয়ে চ্যানেল চালু করেছিলেন। তাদের তীব্র খাদ্য ঘাটতি থাকার পরও আমাদের কয়েক লাখ টন খাদ্য সহযোগিতা করেছিলেন।

 

এখানেই শেষ নয়, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে আমাদের যে ফুটানি তা-ও করছে রাশিয়ার লোকজন রাশিয়ার অর্থে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলার সময়ও কাজটি এগিয়ে চলেছে। আরও কত প্রকল্প, কত ডাক্তার রাশিয়ায় লেখাপড়া করেছে। আমাদের প্রিয় প্রাণ গোপাল বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিল। আরও কত কী। এই কদিন আগেও তো মিগ-২৯ কিনতে বা চুক্তি করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া গিয়েছিলেন। ব্যাপারগুলোকে কি একটুও ভেবে দেখতে হবে না? ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে রাজধানীর বাইরে কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমা নিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম টাঙ্গাইল গিয়েছিলেন। পাকিস্তানি হানাদাররা আমাদের টাঙ্গাইল শহরের বাড়ি পুড়ে ছারখার করে দেওয়ায় স্বাধীনতার পর কিছুদিন আমি ওয়াপদা ডাকবাংলোয় থাকতাম। পাকিস্তানি হানাদারদের চলাচল বন্ধ করতে ঢাকা-টাঙ্গাইল রাস্তা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছিলাম। সেই রাস্তায় ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল পৌঁছে বঙ্গবন্ধু ধূলি-ময়লায় একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। তাই আমার বাথরুমে গোসল করেছিলেন। তার মুজিবকোট ধুলাবালিতে একেবারে পরার মতো ছিল না। কোটটি ব্রাশ করতে গিয়ে এক বিপত্তি বাধে। সহজে ব্রাশ করা যাচ্ছিল না। কারও গায়ে জড়াতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু তখন অনুভূতি ছিল বড় বেশি তীব্র। বঙ্গবন্ধুর কোট কার গায়ে জড়িয়ে ব্রাশ করা হবে শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসায় কেউ কোটটি গায়ে তুলতে চাচ্ছিল না। দুলাল, পিন্টু, মাসুদ, হালিম অথবা অন্য কেউ কোটটি হাতে নিয়ে ভালোভাবে ব্রাশ করতে পারছিল না। সমস্যা দেখে কোটটি নিয়ে ড. নুরুন্নবীর গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলাম। ড. নুরুন্নবী আমাদের চোখে কোনো বেমানান ছিল না। বেটেখাটো সত্য, কিন্তু কখনো অত অদ্ভুত লাগত না। বঙ্গবন্ধুর কোট গায়ে জড়ালে দেখা গেল কোটটি তার হাঁটুর নিচ পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। আসলেই দেখতে বেশ বিসদৃশ লাগছিল। যা হোক গোসল করে পরিষ্কার কাপড়-চোপড় পরে আমরা যখন নিচে নামছিলাম একজন বিদেশি অতিথি এসে হাজির। হাত মিলিয়ে বললেন, ‘আমি আন্দ্রে ফোমিন, বাংলাদেশে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত। মহান সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আপনার মহান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানাতে এসেছি।’ বলেই রাষ্ট্রদূত হাত বাড়িয়ে স্বীকৃতির কাগজ বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিলেন। আমরা ভীষণ খুশি হয়েছিলাম। রাষ্ট্রদূতকে টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসে নিয়ে গিয়েছিলাম। খাওয়ার টেবিলে বঙ্গবন্ধুর সামনাসামনি বসে ছিলেন। আমিও পাশে ছিলাম। সেসব কত মধুর স্মৃতি আজ ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধেও মনে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

     More News Of This Category