আজ ১৪ই আশ্বিন, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু একটি ভাষণ নয়, এ যেন এক অমর কাব্য

প্রতিনিধি নুরুজ্জামান : কবি কবিতা লেখেন, অন্তর্দৃষ্টিতে ভবিষ্যৎ দেখতে পান, ছড়ানো পঙক্তিমালাকে সাজিয়ে মানুষের হৃদয়ের কথা প্রকাশ করেন। তিনি ভাবেন, স্বপ্ন দেখেন, স্বপ্ন দেখান। ছোট্ট একটি কবিতায় মানুষের সারা জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, সংগ্রাম-সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। মানব মনের অব্যক্ত কথা বলেন কবি, প্রকাশ করেন তার হৃদয়ের আকুতি।রাজনীতির কবি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তাঁর অমর কবিতাখানি রচনা করেন। আকাশ-বাতাশ কাঁপিয়ে নিজেই পড়েন সে কবিতা। কবি বলেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু একটি ভাষণ নয়, এ যেন এক অমর কাব্য। কবি তাঁর হৃদয় থেকে উৎসারিত পঙক্তিমালা সাজিয়ে এ কাব্য রচনা করেছেন।প্রস্তুতি নিয়ে নয়, আগে লিখে নয়- বিশাল জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তাদেরই সুখ-দুঃখের কথা ভেবে, ক্লান্ত-ক্লিষ্ট-সংগ্রামী মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে, দেশের আপামর জনগণের কথা ভেবে কবি তাঁর অমর কবিতাখানি রচনা করেন। বজ্র-দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।একটু পিছনের দিকে তাকানো যাক। ১৯৭০ এর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা টালবাহানা করতে থাকে। উল্লেখ্য যে, পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানের উপর পশ্চিম-পাকিস্তানের শোষণ-নিপীড়ন চলতে থাকে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব-পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ এর প্রতিবাদ করলে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করার নানা কূট-কৌশল করতে থাকে। এমতাবস্থায় সত্তরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যগরিষ্ঠতা পাকিস্তানের মসনদে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। ক্ষমতা হস্তান্তরের নানা টাল বাহানার মধ্যেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ৭ মার্চে ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন, রচনা করেন অমর কবিতা। একদিকে স্বাধীনতা প্রত্যাশী বাঙালিদেরকে মুক্তির সঠিক নির্দেশনা দেয়া, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা না লাগানো বঙ্গবন্ধুর কাছে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এসময় তাঁকে সাহস জুগিয়েছেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ফলে বঙ্গবন্ধু কোন লিখিত ভাষণ তৈরি করেননি, শোনেননি কারো পরামর্শ। উপস্থিত জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের মতন করে অমর কাব্য রচনা করে গেছেন। আজ সেটিই পৃথিবীর সেরা ভাষণ, অমর কবিতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী তকমা দিতে যেমন ব্যর্থ হলো; অন্যদিকে তারা এটাও বুঝে গেল যে, বঙ্গবন্ধু কোন আপস করবেন না, বাঙালির মুক্তির প্রশ্নে এতটুকু ছাড় দিবেন না। ঠিক তেমনি দেশের আপামর জনতা আবেগঘন সেই ভাষণ থেকে বুঝে গেলো যে, বঙ্গবন্ধু বাঙালির স্বাধীনতার কথা, মুক্তির কথা অকপটে বলে গেছেন। তিনি তাঁর ভাষণ, তাঁর মহাকাব্য শেষ করেছেন এই বলে যে, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।কার্যত ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ১৮ মিনিটের ওই ভাষণের পর দেশের প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর অধীনে চলে আসে, তাঁর আদেশ-নির্দেশে চলতে থাকে। বাঙালিরা স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ এপ্রিলে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার। ১৯৭১ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নিউজউইক ম্যাগাজিন’ বঙ্গবন্ধুর সেই ভাষণ ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রচ্ছদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের সে প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল: A Poet of Politics অর্থাৎ রাজনীতির কবি। ম্যাগাজিনটি তাদের প্রচ্ছদজুড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি দিয়ে লিড নিউজে তাঁকে অভিহিত করেন ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের জন্যই তাঁকে এ উপাধি দেয়া হয়। শুধু নিউজউইক ম্যাগাজিন নয়, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কো বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে ‘বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একে ‘মেমোরি অব দা ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টার’-এ অন্তর্ভুক্ত করে। বিখ্যাত ইতিহাসবিদ জ্যাকব এফ ফিল্ড বিশ্বের সবচেয়ে উদ্দীপক ও অনুপ্রেরণীয় বক্তব্যগুলো নিয়ে ‘We Shall Fight on the Beaches: The Speeches That Inspired History’ শিরোনামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন। অন্যান্য বিখ্যাত ভাষণের সাথে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটিও উক্ত সংকলনে স্থান পায়। বিশ্ব ইতিহাসে আব্রাহাম লিংকন, উইনস্টন চার্চিল, মাও সে তুং প্রমূখ ব্যক্তিদের ভাষণের সাথে স্থান পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি। ইউনেস্কো-নিউজউইকের পাশাপাশি বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিরাও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও অমর কবিতাকে মূল্যায়ণ করেছেন নানাভাবে। আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ আসলে স্বাধীনতার মূল দলিল’। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটির মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, ‘পৃথিবীর ইতিহাসে যতদিন পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য সংগ্রাম থাকবে, ততদিন শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণটি মুক্তিকামী মানুষের মনে চিরজাগরুক থাকবে। এ ভাষণ শুধু বাংলাদেশের মানুষের জন্য নয়, সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অনুপ্রেরণা’।শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শন ম্যাকব্রাইড বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন, কেবল ভৌগোলিক স্বাধীনতাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন মানুষের মুক্তি। সাম্য নিশ্চিতকরণ ও সম্পদের বৈষম্য দূর করার মধ্যেই নিহিত স্বাধীনতার আসল সার্থকতা। আর এ সত্যের প্রকাশ ঘটে ৭ মার্চের ভাষণে’। পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বলেছেন, ‘৭ মার্চের ভাষণ একটি অনন্য দলিল। এতে একদিকে আছে মুক্তির প্রেরণা, অন্যদিকে আছে স্বাধীনতার পরবর্তী কর্মপরিকল্পনা’। কিউবার অবিসংবাদিত নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ শুধুমাত্র ভাষণ নয়, এটি একটি অনন্য রণকৌশলের দলিল’। আসলে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে কোন একটি শব্দ দিয়ে, কোন একটি বাক্য দিয়ে, কিংবা কোন একটি প্রবন্ধের মাধ্যমে বুঝানো বা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এ এক অনবদ্য ইতিহাস। এ এক অমর কাব্য। এ এক নতুন সৃষ্টির উপাখ্যান। এ এক নতুন অনুভব।

সেটা বুঝেই কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন,

অত:পর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন৷

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,

হদৃয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা৷ কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?

গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানি:

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,

এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম৷’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category